অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Jun 9, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

কর্মক্ষম জনসংখ্যা বাড়ছে, তবু শ্রমবাজারের বাইরে বড় জনগোষ্ঠী

২৮ বছর বয়সি মো. রাকিব ঢাকার মিরপুর এলাকার বাসিন্দা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি শেষ করেছেন বছরখানেক হলো। তবে এখনো তিনি কোনো চাকরি পাননি। তিনি বলছিলেন, স্নাতকোত্তর শেষ করেছি এক বছর হলো, এখনো ঠিকমতো কোনো কাজ পাইনি। চেষ্টা করছি, কিন্তু কোথাও সুযোগ পাচ্ছি না। বেশির ভাগ জায়গায় অভিজ্ঞতা খুঁজছে। আর নতুন যেখানে-সেখানে বেতন খুবই কম। রাকিবের এই অভিজ্ঞতা একার নয় বাংলাদেশের বড় একটি অংশ এখনো শ্রমবাজারের বাইরে রয়ে গেছে, যদিও দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৫৮ লাখ ৩০ হাজার। এর মধ্যে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সি অর্থাৎ কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ১১ কোটি ৪৪ লাখের বেশি। মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশ এখন কর্মক্ষম বয়সে, যা একটি বড় জনমিতিক সুযোগ হিসেবে ধরা হয়। এ ছাড়া ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি তরুণ জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ১৫ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৯ দশমিক ১১ শতাংশ। অন্যদিকে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি তরুণ শ্রমশক্তির সংখ্যা ২ কোটি ৬৭ লাখ। কিন্তু এই বড় জনগোষ্ঠীর সবাই শ্রমবাজারে সক্রিয় নয়।

শ্রমশক্তি জরিপের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ১৫-৬৪ বছর বয়সিদের মধ্যে মাত্র ৬২ দশমিক ৪ শতাংশ শ্রমবাজারে রয়েছে অর্থাৎ তারা কাজ করছে বা কাজ খুঁজছে। অন্যদিকে, শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৫৮ দশমিক ৯০ শতাংশ, যা দেখায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে।

শ্রমশক্তির জরিপ বলছে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি তরুণ শ্রমশক্তির প্রায় ২০ লাখই বেকার। তাদের মধ্যে সাড়ে ১৩ শতাংশ স্নাতক ডিগ্রিধারী এবং ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ উচ্চ মাধ্যমিক পাস। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজন বেকারের একজন স্নাতক বা উচ্চ মাধ্যমিক সনদধারী। শুধু তা-ই নয়, ১৫-২৯ বছর বয়সি যুব বেকারদের মধ্যে প্রায় ২৯ শতাংশ স্নাতক। এর মানে দাঁড়ায় প্রতি তিনজন স্নাতক তরুণের একজন বেকার।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করছে। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু অর্থনীতিতে সেই অনুপাতে মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। ফলে অনেকেই শ্রমবাজারে ঢুকছে না, বা ঢুকলেও টিকে থাকতে পারছে না।

দেশে ১১ কোটির বেশি কর্মক্ষম মানুষ : বিবিএসের হিসাব বলছে, বর্তমানে শূন্য থেকে ১৪ বছর বয়সি জনসংখ্যা ৪ কোটি ৯৪ লাখ, ১৫-৬৪ বছর বয়সি ১১ কোটি ৪৪ লাখ এবং ৬৫ বছরের বেশি ১ কোটি ১৯ লাখের বেশি। ২০১১ সালের তুলনায় শিশুদের (শূন্য থেকে ১৪) অংশ কমে এসেছে। বেড়েছে বয়স্কদের সংখ্যা।

এই পরিবর্তনকে জনমিতিক রূপান্তর হিসেবে দেখা হয়। অর্থনীতির ভাষায়, এটি ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-যেখানে বেশি কর্মক্ষম মানুষ থাকলে উৎপাদনশীলতা বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। তবে শর্ত একটাই-এই মানুষদের কাজের মধ্যে আনতে হবে। দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়ার অর্থ হলো প্রতি বছর নতুন করে বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। কিন্তু সেই হারে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

বর্তমানে দেশে তরুণ বেকার প্রায় ২৭ লাখ। যা মোট জনসংখ্যার হার ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। সংখ্যাটি তুলনামূলক কম মনে হলেও বাস্তবে অনেকেই আংশিক বেকার বা কম আয়ের কাজে যুক্ত।

নারীরা পিছিয়ে পড়ছে শ্রমবাজারে : শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বৈষম্য দেখা যায় নারীদের ক্ষেত্রে। সবশেষ জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে পুরুষের চেয়ে নারীর অনুপাত বেশি। তবে শ্রমশক্তিতে পুরুষের চেয়ে পিছিয়ে নারীরা। আর সাড়ে ২৭ লাখ বেকারের মধ্যে প্রায় ১০ লাখই নারী। উচ্চশিক্ষিত নারীদের মধ্যেই বেকারত্ব বেশি। বৈষম্য, সামাজিক অবকাঠামো, কাজের পরিবেশ অনুকূলে না থাকায় অনেক নারীই আগ্রহ হারাচ্ছেন কর্মক্ষেত্রের ওপর থেকে। এমন হলে দেশের অর্থনৈতিক পরিধি বৃদ্ধিতে বাধা আসবে বলে মত বিশ্লেষকদের।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই পতন উদ্বেগজনক। কারণ, নারীর অংশগ্রহণ বাড়লে অর্থনীতির সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

বিবিএসের হিসাবে, ২০১৫-১৬ সালে নারী শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ছিল ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ধীরে ধীরে বেড়ে ২০২২ সালে ৪২ দশমিক ৭৭ শতাংশে পৌঁছায়। কিন্তু এরপর আবার কমে ২০২৩ সালে ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৩৮ দশমিক ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। বর্তমানে এই সংখ্যা আরও বেড়েছে। ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ কমে যাওয়া মানে আমরা আমাদের সম্ভাবনার বড় একটি অংশ ব্যবহার করতে পারছি না। সামাজিক বাধা, নিরাপত্তা, উপযুক্ত কাজের অভাব-সব মিলিয়ে নারীরা পিছিয়ে পড়ছে।

শিশু কমছে, বাড়ছে বয়স্ক জনগোষ্ঠী : জনসংখ্যার কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন আসছে। ২০১১ সালে যেখানে শিশুদের হার ছিল ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ, সেখানে ২০২৬ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৮ দশমিক ১ শতাংশে। অন্যদিকে, ৬৫ বছরের বেশি মানুষের হার বেড়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ৬ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছেছে। বিবিএসের হিসাবে, শূন্য থেকে ১৪ বছর বয়সি শিশুর সংখ্যা এখন প্রায় ৫ কোটি। আর ৬৫ বছরোর্ধ্ব বয়স্ক মানুষের সংখ্যা এখন দেড় কোটির কাছাকাছি।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিজ্ঞানীদের মৌলিক গবেষণায় আত্মনিয়োগ করতে হবে- কৃষিমন্ত্রী

1

বাংলাদেশে জাহাজ নির্মাণে বিনিয়োগে আগ্রহী মারস্ক

2

সমাজের প্রত্যেক স্তর থেকে দুর্নীতি নির্মূল করতে হবে: স্বাস্থ

3

নবসৃষ্ট বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের নামফলক উন্মোচন।

4

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃ

5

তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে প্রচার জোরদারের তাগিদ

6

জাতীয় ঐক্য ও দেশ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করছে সরকার: স্বরাষ্ট্র

7

মগবাজারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস দুর্ঘটনায় ৮ শিক্ষার্থী আহত

8

ব্রাজিলের সামনে ‘হেক্সা’ সমীকরণ: গৌরবের শিরোপা নাকি হতাশার র

9

নরওয়ের রাজার মৃত্যুতে শোক জানালেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী

10

কিশোরগঞ্জের উন্নয়নে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান তথ্য প্রতিমন

11

রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধী অপরাধীই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

12

শহীদ ওয়াসিমের কবর জিয়ারত করলেন প্রধানমন্ত্রী

13

খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে জীবনযাত

14

এলজিইডিতে কর্মচারীদের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি

15

আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন মেসি

16

জীবনমান উন্নয়ন ও টেকসই অগ্রগতিই সরকারের লক্ষ্য: চিফ হুইপ

17

বাংলাদেশ রেলওয়ের রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে জরিপে প

18

একনেকে ১০ উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন, অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে প্

19

এনসিপিতে যোগ দিয়ে মেয়র নির্বাচন করার বিষয়ে যা বললেন মনজুর আল

20