অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Oct 4, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

জীবনযুদ্ধে সফল খাদিজার বাগানে বিদেশি ফলের সমারোহ

স্বামীকে হারানোর পর সংসার ও দুই সন্তানের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে থেমে থাকেননি নীলফামারীর জলঢাকার খাদিজা আক্তার। কঠোর পরিশ্রমে গড়ে তুলেছেন পাঁচ বিঘার দেশি-বিদেশি ফলের বাগান; এখন কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে বছরে আয় করছেন ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা।

কঠিন পরিস্থিতিকে জয় করে নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার খাদিজা আক্তার এখন সফল নারী কৃষি উদ্যোক্তা। স্বামীর মৃত্যুর পর দুই সন্তানের লেখাপড়া, সংসার ও ব্যবসার দায়িত্ব সামলে তিনি গড়ে তুলেছেন পাঁচ বিঘা জমির দেশি-বিদেশি ফলের বাগান। বাগানে কফি, রামবুটান, কোকো, ড্রাগন ও প্যাশন ফ্রুটসহ বিভিন্ন ফলের চাষ করছেন তিনি।

জলঢাকা উপজেলার কৈমারী ইউনিয়নের শৌলমারী সুনগর গ্রামের বাড়ির পাশে গড়ে তোলা এই বাগান থেকে ইতোমধ্যে ফলন পাওয়া শুরু হয়েছে। ফল বিক্রি করে খরচ বাদে বছরে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা আয় করছেন খাদিজা। বাগানের সব গাছ ফল দেওয়া শুরু করলে আয় আরও বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি।

২০১৪ সালে হৃদরোগসহ নানা জটিলতায় স্বামী নজরুল ইসলামের মৃত্যু হলে বিপাকে পড়েন খাদিজা। তখন তাঁর বড় ছেলে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এবং ছোট ছেলে এইচএসসি প্রথম বর্ষে পড়ছিলেন। স্বামীর রেখে যাওয়া ব্যবসা ও জমির ফসলই ছিল পরিবারের আয়ের প্রধান অবলম্বন।

স্বামীর মৃত্যুর পর স্থানীয় কৈমারী বাজারে থাকা তাঁর স্টেশনারি ব্যবসার দায়িত্ব নেন খাদিজা। একই সঙ্গে সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। পরে কৃষিকাজেও মনোযোগ দেন তিনি। কঠোর পরিশ্রম ও মেধা কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে নিজেকে কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

খাদিজা জানান, সংসার, সন্তান ও ব্যবসা একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে তাঁকে অনেক কঠিন সময় পার করতে হয়েছে। পেছনে ফিরে তাকালে এখন তাঁর নিজের কাছেই অবাক লাগে—কীভাবে এত কিছু সামলে উঠেছেন।

তিনি বলেন, স্বামী মৃত্যুর আগে ছেলেদের নিয়ে অনেক স্বপ্নের কথা বলেছিলেন। সেই স্বপ্ন পূরণে বড় ছেলে মো. আখতারুজ্জামান নর্দান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ এবং ছোট ছেলে সেফায়েত নামরাত গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষি অনুষদে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে বড় ছেলে একটি বেভারেজ কোম্পানিতে জ্যেষ্ঠ এক্সিকিউটিভ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। ছোট ছেলে ২০২৫ সালে মাস্টার্স শেষ করে চাকরির প্রস্তুতির পাশাপাশি মায়ের বাগানের কাজে সহযোগিতা করছেন।

কৃষিতে নতুন যাত্রা

২০১৮ সালে কৃষিতে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করেন খাদিজা। কফি তাঁর পছন্দের পানীয় হওয়ায় বড় ছেলের পরামর্শে বাড়ির পাশে থাকা পতিত জমি পরিষ্কার করে কফি চাষ শুরু করেন। পার্শ্ববর্তী কিশোরগঞ্জ উপজেলা থেকে অ্যারাবিকা জাতের কফির চারা এনে বাগানে রোপণ করেন।

এরপর ধীরে ধীরে বাগানে রামবুটান, কোকো, ড্রাগন ফল ও প্যাশন ফ্রুটসহ বিভিন্ন বিদেশি ফলের গাছ যুক্ত করেন। তিন বছরের মধ্যে এসব গাছে ফল আসতে শুরু করে। পাশাপাশি রঙিন মাছের পোনা উৎপাদনও শুরু করেন তিনি।

বাগান করার সময় নানা ধরনের কথাও শুনতে হয়েছে বলে জানান খাদিজা। তিনি বলেন, একদিকে স্বামীর ব্যবসা, অন্যদিকে বাগান করা—দুই দিক সামলাতে গিয়ে অনেক কটু কথা শুনেছেন। তবে এসব কারণে তিনি কখনো পিছিয়ে যাননি।

পাঁচ বিঘায় বহুমুখী উদ্যোগ

খাদিজার প্রায় পাঁচ বিঘার বাগানের তিন বিঘা জমিতে কফি এবং বাকি দুই বিঘায় রামবুটান, ড্রাগন ফল, প্যাশন ফ্রুট, কোকোসহ বিভিন্ন ফলের গাছ রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বাগানে রয়েছে নানা জাতের দেশি-বিদেশি ফলের গাছ। বাড়ির প্রবেশপথের মাচায় ছড়িয়ে আছে প্যাশন ফ্রুটের লতা। এক পাশে পুকুর, অন্য পাশে ফলের বাগান। বাড়ির আঙিনায় আম, লিচু, তেঁতুল ও তেজপাতাসহ বিভিন্ন গাছ রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে রঙিন মাছের পোনা উৎপাদনের ব্যবস্থা।

খাদিজা জানান, বাগান করার কয়েক বছরের মধ্যেই ফলন পাওয়া শুরু হয়। প্রায় ছয় বছর ধরে কফি বাজারজাত করছেন তিনি। গত বছর প্রতি কেজি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা দরে প্রায় ৪০০ কেজি রামবুটান বিক্রি করেন। চলতি বছর তিনটি গাছ থেকে প্রায় ৮০ কেজি রামবুটান পেয়েছেন।

তিনি জানান, বাগান থেকে প্রতিবছর খরচ বাদে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা আয় হচ্ছে। কফি প্রতি কেজি ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া চলতি বছর রঙিন মাছের পোনা বিক্রি করে প্রায় ৫ হাজার টাকা আয় হয়েছে।

নার্সারিতেও সফলতা

ফল উৎপাদনের পাশাপাশি নার্সারিও গড়ে তুলেছেন খাদিজা। সেখানে বর্তমানে ২ হাজার ৫০০টি কফির চারা, ৩০০টি রামবুটানের চারা এবং ২০০টি কোকো ফলের চারা রয়েছে। অনলাইনের মাধ্যমে এসব চারা বিক্রি করছেন তিনি।

এ কাজে মাকে সহযোগিতা করছেন কৃষিবিদ ছোট ছেলে সেফায়েত নামরাত। তিনি বলেন, অবসর সময়ে মায়ের সঙ্গে বাগানের পরিচর্যা এবং অনলাইনে ফল ও চারা বিক্রির কাজে সহযোগিতা করেন। ভবিষ্যতে বাগানটি আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

কঠোর পরিশ্রম ও মেধা কাজে লাগিয়ে স্বামীর ব্যবসা ও কৃষিজমি ধরে রাখার পাশাপাশি নিজের আয় থেকে এ পর্যন্ত ৭৫ শতাংশ জমি কিনেছেন খাদিজা। চলতি বছর তিনি জেলার সেরা নারী কৃষি উদ্যোক্তার পুরস্কার পেয়েছেন। এর আগে ২০২২ সালে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহে রঙিন মাছের পোনা উৎপাদনের জন্য সম্মাননাও পান।

খাদিজা বলেন, তাঁর মতো অন্য নারীরাও যেন এগিয়ে আসেন, সেটিই তাঁর প্রত্যাশা। বাণিজ্যিকভাবে না হলেও বাড়ির আশপাশের পতিত জমিতে ফলের গাছ লাগিয়ে পরিবারের ফলের চাহিদা পূরণ করার আহ্বান জানান তিনি।

কৈমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সাদেকুল সিদ্দিক বলেন, খাদিজা আক্তার একজন সংগ্রামী নারী। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি একাই সংসার, ব্যবসা ও সন্তানদের লেখাপড়ার দায়িত্ব সামলেছেন। বর্তমানে তিনি একজন সফল নারী কৃষি উদ্যোক্তা। তাঁকে দেখে গ্রামের অনেকেই বাড়িতে দেশি-বিদেশি ফল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোছা. হোমায়রা মন্ডল বলেন, কৃষির প্রতি খাদিজা আক্তারের আগ্রহ থেকেই তিনি কৃষি উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন। কৃষি বিভাগ বিভিন্ন সময়ে তাঁকে পরামর্শ, উপকরণ, চারা ও যন্ত্রপাতি দিয়ে সহযোগিতা করেছে। তাঁকে দেখে এলাকার অন্য নারী ও পুরুষরাও কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।

সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের আবাসন ও জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে সরকার:

1

ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড বিতরণ বাংলাদেশের ইতিহাসে মাইলফলক: বুলু

2

একনেক সভায় ১৫ হাজার ৮২৩ কোটি টাকার ১৩ প্রকল্প অনুমোদন

3

দুর্গাপূজায় সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখার আহ্

4

সার্ক পুনরুজ্জীবনে ভুটানের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ

5

২০২৭ সালের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের অঙ্গীকার সরকারের

6

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পরিকল্পনায় শান্তকে দলে ফেরানো: সালাহউ

7

মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলনে সহিংসতার ঘটনায় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের

8

গাবতলী-নারায়ণগঞ্জ মেট্রোরেলে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন চাইল সরকা

9

অটল নীতি ও বস্তুনিষ্ঠতায় অনন্য: এলজিইডির রিভার প্রকল্পে আতি

10

জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ স্থানীয় সরক

11

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যুতে তথ্যমন্ত্রীর শোক

12

জাপান সফরে একাধিক সমঝোতা স্মারক সইয়ের আশা প্রধানমন্ত্রীর

13

এতিম পাঁচ কন্যার পরিবারের পাশে দাঁড়ালেন প্রধানমন্ত্রী

14

বাউবির এলএলবি অনার্সের ১৩তম ব্যাচের ওরিয়েন্টেশন

15

প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে কারিগরি ত্রুটি, বিমানের তদন্ত কমিটি গ

16

নেগেটিভ মন্তব্য এড়িয়ে চলার সহজ উপায় জানালেন স্বস্তিকা

17

ঢাকার ২০ জোনে বিশেষ কমিটি, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও পরিচ্ছন্নতায় জ

18

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বিমান চলাচলে ধাক্কা

19

সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে সরকার: স

20