
উবার ও ওয়েমোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের অস্টিনে চালকবিহীন রোবোট্যাক্সি ‘সাইবারক্যাব’ চালু করেছে বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা টেসলা। বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন এই যানটির যাত্রা শুরুর ঘোষণা দেয় প্রতিষ্ঠানটি।
২০২৪ সালের অক্টোবরে প্রথমবার প্রদর্শন করা সোনালি রঙের সাইবারক্যাবে নেই ব্রেক, অ্যাক্সিলারেটর প্যাডেল কিংবা স্টিয়ারিং হুইল। দুই যাত্রী বহনে সক্ষম গাড়িটি মূলত চালক ছাড়াই ট্যাক্সি সেবা দেওয়ার জন্য তৈরি করেছে টেসলা।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, টেসলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইলন মাস্ক বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে অস্টিন শহরের ওপর বিশাল আকারে সাইবারক্যাবের একটি ছবি প্রকাশ করেন। ছবিতে গাড়িটির পেছনে ধুলোর মেঘ দেখা যায়। টেসলার সদর দপ্তরও অস্টিনে অবস্থিত।
আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগেই অস্টিনের বিভিন্ন সড়কে সাইবারক্যাব দেখা গেছে। টেসলার হালনাগাদ করা অ্যাপেও যাত্রীরা নতুন এই গাড়ি বেছে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা পর্যটক গ্রাহাম স্প্রিগ এএফপিকে বলেন, ‘এটি মানবজাতির জন্য পরিবর্তন নিয়ে আসবে।’ তাঁর মতে, এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকানার পরিবর্তে পরিবহনকে একটি সেবা হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য এটি উপকারী হবে বলেও তিনি মনে করেন।
অস্টিনে টেসলার আয়োজিত অনুষ্ঠানে ইলন মাস্ক বলেন, শহরজুড়ে ব্যাপকভাবে নতুন এই যান ‘সাইবারক্যাব’ দেখা যাবে। তবে বিনোদনকেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি ছিল শুধু আমন্ত্রিতদের জন্য। সেখানে গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার ছিল না।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম অস্টিন আমেরিকান-স্টেটসম্যানের প্রতিবেদনে বলা হয়, অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরাই প্রথম চালকবিহীন সাইবারক্যাবে চড়ার সুযোগ পান। শুক্রবার থেকে সাধারণ মানুষের জন্য এই সেবা চালুর কথা রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন পোস্টে দেখা যায়, অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আসা অনেকেই সাইবারক্যাবের সোনালি রঙের সঙ্গে মিল রেখে সোনালি পোশাক পরেছিলেন।
টেসলা তাদের বিভিন্ন প্রচারে সাইবারক্যাবের নিরাপত্তা এবং প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য এর সুবিধার বিষয়টি তুলে ধরেছে। প্রতিষ্ঠানটি গাড়িটিকে ‘সবার জন্য পরিচ্ছন্ন পরিবহনকে সহজলভ্য করার’ উদ্যোগ হিসেবেও বর্ণনা করেছে।
এর আগে গত বছর অস্টিনে টেসলা তাদের মডেল ওয়াই এসইউভি ব্যবহার করে চালকবিহীন গাড়ির রোবোট্যাক্সি সেবা চালু করে। পরে টেক্সাস, ফ্লোরিডা ও ক্যালিফোর্নিয়ার আরও কয়েকটি শহরে ধীরে ধীরে এই সেবা সম্প্রসারণ করা হয়।
তবে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আইনে এসব গাড়ির অনেকগুলোর ক্ষেত্রে একজন মানব তত্ত্বাবধায়ক বা চালককে প্রস্তুত থাকতে হয়, যাতে প্রয়োজন হলে তিনি গাড়ির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেন।
গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটের চালকবিহীন গাড়ি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওয়েমো বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি শহরে সেবা পরিচালনা করছে।
টেক্সাস মোটরযান বিভাগের তথ্যের ভিত্তিতে এফএসডি ডেটাবেসের হিসাবে, বুধবার পর্যন্ত টেক্সাসে টেসলার নিবন্ধিত রোবোট্যাক্সির সংখ্যা ছিল ৩১৪টি। এর মধ্যে ৪৫টি ছিল সাইবারক্যাব।
টিডি সিকিউরিটিজের বিশ্লেষক ইতাই মিখায়েলি এএফপিকে বলেন, রোবোট্যাক্সির মতো সাইবারক্যাবের সেবাও শুরুতে ধীরগতিতে এগোবে বলে তিনি মনে করছেন। প্রাথমিক ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে পাওয়া মতামত বিবেচনা করে টেসলা পরবর্তী সময়ে এই সেবা আরও সম্প্রসারণ করতে পারে বলে তিনি জানান।
স্বয়ংক্রিয় যানবাহন পরিচালনার ক্ষেত্রে টেক্সাসের আইন তুলনামূলকভাবে সহায়ক হওয়ায় ওয়েমো ও জুক্সের মতো ইতোমধ্যে কার্যক্রম চালানো প্রতিষ্ঠান এবং মোটিনালের মতো পরীক্ষামূলক পর্যায়ের কোম্পানির জন্যও অঙ্গরাজ্যটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
নিউইয়র্কভিত্তিক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কর্নেল টেকের জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী অ্যান্থনি টাউনসেন্ড বলেন, ‘টেসলা আসলে মাত্র শুরু করেছে।’
চালকবিহীন ট্যাক্সি খাতে প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকায় কোন কোম্পানি সবচেয়ে কার্যকর ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করতে পারে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
টাউনসেন্ড এক প্রতিবেদনে বলেন, চালকবিহীন ট্যাক্সি কোম্পানিগুলো একসময় মানবচালিত গাড়ির তুলনায় কম খরচে সেবা দিতে পারবে—এমন প্রত্যাশা দীর্ঘদিনের। তবে সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে আর কত সময় লাগবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। একইভাবে এসব কোম্পানি কবে লাভ-ক্ষতির সমতা বা সমপর্যায়ের অবস্থায় পৌঁছাবে, সেটিও অনিশ্চিত।